লোককথা গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।

লোককথা গুরুত্ব আলোচনা করো।

লোককথার গুরুত্ব লোককথার কাহিনিগুলি ইতিহাস- নির্ভর না হলেও ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, যেমন—

লোককথা গুরুত্ব আলোচনা করো।

(1) সমাজ-সংস্কৃতির পরিচয়: কোনো সমাজে সৃষ্ট লোককথাগুলিতে সেই সমাজের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় প্রভৃতি বিষয়ের যথেষ্ট প্রভাব পড়ে।

ফলে অতীতকালে সেই সমাজের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ঐতিহ্য কেমন ছিল তার মোটামুটি আভাস সেই সমাজে সৃষ্ট লোককথার কাহিনিগুলি থেকে জানা যায়।

(2) ঐতিহাসিক ধাঁচের আড্ডাস : বিভিন্ন সমাজের ঐতিহাসিক কাহিনির অনুকরণে বিভিন্ন লোককথার প্রচলন ঘটতে দেখা যায়। এরূপ লোককথার কাহিনিগুলি থেকে সেই সমাজের ঐতিহাসিক ধাঁচ সম্পর্কে আভাস পাওয়া যায়, যেমন—

মধ্যযুগের বাংলার চাঁদ সদাগরের কাহিনিতে সপ্তডিঙা মধুকর ভাসিয়ে দূরদেশে চাঁদের বাণিজ্য করতে যাওয়ার যে ঘটনা বাংলার লোককথায় পাওয়া যায় তা থেকে এই ঐতিহাসিক সত্যটুকু অবশ্যই উপলব্ধি করা যায় যে, সে যুগে বাংলার বণিকরা দূরদেশে বাণিজ্য করতে যেত।

(3) মনোরঞ্জন : লোককথার গল্পগুলি মানুষকে যুগের পর যুগ ধরে আনন্দদান করেছে। যে যুগে বিজ্ঞানের বিশেষ উন্নতি ঘটেনি বা শিক্ষার প্রসার ঘটেনি সে যুগে লোককথার গল্পগুলি ছিল মানুষের মনোরঞ্জনের অন্যতম মাধ্যম।

(4) শিক্ষাদান : লোককথার গল্পগুলি মানুষকে জীবনে চলার পথে যথার্থ শিক্ষা দান করে। এজন্য বিখ্যাত বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন যে, “যদি তোমার সন্তানকে বুদ্ধিমান করে তুলতে চাও তবে তাদের লোককথার গল্প পড়তে দাও।

যদি তাদের আরও বুদ্ধিমান করে তুলতে চাও তবে তাদের আরও বেশি লোককথার গল্প পড়তে দাও।”

লোককথা বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।

লোককথার বৈশিষ্ট্য লোককথার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়, যেমন—

1. শিশুদের জন্য রসদ : কিংবদন্তি, পুরাণ প্রভৃতির কাহিনিগুলিতে শিশু-কিশোর, যুবক, বয়স্ক প্রভৃতি সকলের জন্য রসদ থাকে। কিন্তু লোককথায় সাধারণত শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য রসদ থাকে।

2. অজ্ঞাতপরিচয় লেখক : সাধারণভাবে লোককথার প্রকৃত সৃষ্টিকর্তা বা রচয়িতাদের পরিচয় সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে আসল লোককথাগুলি পরিমার্জন করে যাঁরা এগুলি আবার প্রকাশ করেন তাঁদের কিছু কিছু নাম বা পরিচয় সম্পর্কে জানা যায়।

3. অলিখিত কাহিনি : লোককথার কাহিনিগুলি সাধারণত অলিখিত হয়। অবশ্য বর্তমানকালে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার লোককথাগুলি সংগ্রহ করে বিভিন্ন গবেষক লিখিত বইয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করছেন।

4. ধর্মীয় বিষয়ের গুরুত্বহীনতা: লোককথার কাহিনিতে ধর্মীয় বিষয়বস্তুর বিশেষ গুরুত্ব লক্ষ করা যায় না। এসব কাহিনিতে স্বর্গীয় বা ঐশ্বরিক ঘটনার বর্ণনার বিশেষ গুরুত্ব নেই।

5. মানুষের আলোচনা : লোককথার বর্ণনায় মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের বিভিন্ন সাধারণ ঘটনাবলিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখের বিষয়গুলি লোককথার গল্পে বিশেষ গুরুত্ব পায়।

6. অতিপ্রাকৃতিক বিষয় : লোককথার কাহিনির মধ্যে মানুষের সঙ্গে বিভিন্ন ভৌতিক বা অতিপ্রাকৃতিক চরিত্র, যেমন— ডাইনি, দৈত্য, পরি, ড্রাগন প্রভৃতি থাকে। তা ছাড়া এসব কাহিনিতে বিভিন্ন পশুপাখি, ম্যাজিকের ঘটনা প্রভৃতি থাকে।

7. ব্যক্তিত্ব আরোপ : লোককথার গল্পগুলিতে বিভিন্ন পশুপাখি ও কীটপতঙ্গের মধ্যে মানুষের মতো ব্যক্তিত্ব আরোপিত হতে দেখা যায়। তারা মানুষের মতো কথা বলে এবং নিজেদের চিন্তার প্রকাশ ঘটায়।

৪. অনির্দিষ্ট স্থান-কাল-পাত্র : লোককথার গল্পের স্থান-কাল-পাত্রের কোনো সুনির্দিষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না। “একদা এক দেশে এক রাজা বাস করত” — এই ধরনের অনির্দিষ্ট স্থান-কাল-পাত্র দিয়ে লোককথার গল্পগুলি শুরু হয়।

9. প্রসার : সুদারল্যান্ড ও আলবাথনট মনে করেন যে, দূরদেশে যাত্রা করা নাবিক, সন্ন্যাসী, চারণকবি, যোদ্ধা, যুদ্ধে শত্রুপক্ষকে পরাজিত ও বন্দি করে নিয়ে যাওয়া শত্রুপক্ষের যোদ্ধা, ক্রীতদাস, নারী প্রমুখের মাধ্যমে কোনো সমাজের লোককথার কাহিনিগুলি দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে।

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.